অবৈধ করাত কলে উজার হচ্ছে বনাঞ্চল, বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ
প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬, ১০:২০ পূর্বাহ্ন | পরিবেশ ও জলবায়ু
মোঃ শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া আসাদ (খাগড়াছড়ি) : খাগড়াছড়ির রামগড়ে অবৈধ করাত কলে নির্বিচারে উজাড় হচ্ছে বনের কচি-কাঁচন গাছ, বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ। রাতে কিংবা দিনে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে করাতকলে চলছে কাঠ চেরাই। অনুমোদনহীন এসব করাত কল স্থাপন করা হয়েছে মূল সড়কের পাশে, সীমানা ঘেঁষে। এসব মিলের নেই কোনো সরকারি অনুমোদন। জানা গেছে, রামগড়ে ১৯টি করাতকলের মধ্যে বেশিরভাগই চলছে অবৈধভাবে।
বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, পার্বত্য অঞ্চলে চার শ্রেণির বন রয়েছে। সেগুলো হলো, সংরক্ষিত বন, রক্ষিত বন, ব্যক্তিমালিকাধীন বন ও অশ্রেণিভুক্ত বন৷ তবে বেশির ভাগই অশ্রেণিভুক্ত বনের আওতাভুক্ত।
জানা যায়, বিগত কয়েক দশকে সংরক্ষিত বন ও অশ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চল ব্যাপক হারে উজাড় হয়েছে। বনখেকোদের দৌরাত্ম্যে নির্বিচারে কাটা হচ্ছে এসব বনের গাছ । বিশেষ করে পাহাড় থেকে পরিবহণ করে এসব কাঠ বিভিন্ন উপজেলায় পোঁড়াতে এবং স'মিল গুলোতে নেয়া হয় পক্রিয়াজাত করতে। রাতের আঁধারে ট্রাক যোগে এসব কাঠ পাচার করা হয় ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায়। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যেই হারিয়ে যাবে প্রাকৃতিক বন অভিমত অভিজ্ঞজনদের। কোন এক সময় প্রতি মৌসুমে একটি ইট ভাটায় গড়ে, ১লক্ষ মন কাঠ পুড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব কাঠ জোগাড় হয়েছে আশপাশের বনাঞ্চল থেকেই। যার ফলে উজাড় হয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি অঞ্চল, বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ছে পাহাড়।
বন ও পরিবেশ আইন অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপনের কোনো সুযোগ বা নিয়ম নেয়। তবে এসবের তোয়াক্কা করেন না বনখেকোরা। বনাঞ্চল ঘিরেই অবৈধভাবে করাতকল স্থাপন করে দিনে-রাতে কাঁটা হচ্ছে এসব বনের কাঠ।
করাতকল মিস্ত্রিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিটি করাতকলে দৈনিক অন্তত ১০০ থেকে ১৫০ ঘনফুট পর্যন্ত কাঠ চিরানো হয়। সেই হিসেবে খাগড়াছড়ি জেলার করাতকলগুলোতে সপ্তাহিক গড়ে অন্তত সাড়ে ২২ হাজার ঘনফুট কাঠ চেরানো হয়। বছর শেষে যার পরিমাণ ৮০ লাখ ঘনফুট ছাড়িয়ে যায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় রামগড় বাজার, তৈছালা পাড়া, নজিরটিলা, পাতাছড়া, নাকাপা, সোনাইপুল, বলিপাড়া, খাগড়াবিল, কালাডেবা এলাকায় গড়ে উঠেছে এসব অবৈধ করাত কল। যার ফলে উজাড় হচ্ছে প্রাকৃতিক বন।
এছাড়া অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে বনের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বন ধ্বংসের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে শত প্রজাতির বৃক্ষ, লতা-গুল্ম। বিচরণ ক্ষেত্র কমে যাওয়ায় বনের উপর নির্ভরশীল বণ্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এসব নিয়ে বন বিভাগের কোন নজরদারি নেই। প্রাকৃতিক বন বিপন্ন হওয়ায় বিপন্ন হয়ে উঠছে বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষরা। বন ধ্বংস হওয়ায় পানি উৎস কমেছে প্রায় ৬১ শতাংশ। শুষ্ক মৌসুমে ঝিরি ঝরনায় পানি উৎস কমে আসে। কমে যাচ্ছে বন্যপ্রাণীসহ জীব বৈচিত্র।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ বিষয়ে জানতে ক্ষুদ্র কাঠ ব্যবসায়ী সমিতির একজনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এ অভিযোগ সত্য নয়। বৈধভাবেই তারা কাঠ ব্যবসা করে আসছেন।
কালাডেবা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ রেজাউল সহ কয়েকজন জানান, অবৈধ করাত কল বন্ধে প্রশাসন এবং বনবিভাগ কখনো অভিযান উচ্ছেদ প্রক্রিয়া চোখে পড়েনি। এতে মালিকরা কোন ধরনের বাঁধাহীন ভাবে বছরের পর বছর প্রকাশ্যে এসব স'মিলে বনাঞ্চলের গাছ চেরায় ও সামাজিক বনায়নের গাছ কর্তন করে যাচ্ছেন।
খাগড়াছড়ি পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দদের মতে, এ সংকট নতুন নয়। দীর্ঘ বছর ধরে অবাধে বন ধ্বংসের ফলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু হয়েছে। পাহাড়ে বনের কাঠ কর্তনের উপর একটি দীর্ঘ সময়ের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা না গেলে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসবে।
রামগড় বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা খলিলুর রহমান জানান, অবৈধ করাতকল গুলোর তালিকা করা হচ্ছে। তবে ইতিমধ্যে অনেকেই করাতকলের লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করেছে। এছাড়াও বনের কাঠ পোড়ানো হলে উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
রামগড় উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহি কর্মকর্তা কাজী শামীম বলেন, সব ধরনের অবৈধ কার্যক্রম প্রতিরোধে সক্রিয় রয়েছে প্রশাসন। খুব দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হবে। আর এসব অবৈধ করাত কল বন্ধে রামগর বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
