দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে বুড়িগঙ্গা থেকে মাটি চুরির মহোৎসব: নদী ভাঙনের আতঙ্কে হাজারো পরিবার
প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬, ১২:৫৩ অপরাহ্ন | পরিবেশ ও জলবায়ু
মাহফুজার রহমান :
ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নে বুড়িগঙ্গা নদী থেকে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলনের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে দৈনিক অর্থনীতির কাগজের কাছে । স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের ছত্রছায়ায় প্রতিদিন প্রকাশ্য দিবালোকে নদীর বুক চিরে মাটি চুরি করা হচ্ছে। এর ফলে নদীপাড়ের সাধারণ বাসিন্দারা তাদের ভিটেমাটি হারানোর চরম শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
কোন্ডা ইউনিয়নের জাজিরা ও বোটঘাট এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদী থেকে মাটি চুরির হিড়িক পড়েছে। সারি সারি ট্রলার দিয়ে এই মাটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পার্শ্ববর্তী ইটভাটায়। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র অন্তত ১০টি গ্র্যাব ড্রেজার বসিয়ে নদী থেকে মাটি তুলছে। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রায় অর্ধশতাধিক ট্রলারের মাধ্যমে এই কর্মযজ্ঞ চলে। প্রতিটি ট্রলার ভর্তি মাটি বিক্রি করা হচ্ছে আনুমানিক ৫ হাজার টাকায়। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন কয়েক লক্ষ টাকার মাটি নদী থেকে অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
অভিযুক্তদের দাপট ও স্থানীয়দের আর্তনাদ : এলাকাবাসীর অভিযোগের আঙুল স্থানীয় প্রভাবশালী কতিপয় ব্যক্তির দিকে। তাদের মধ্যে সৌরভ, রনি, এস আলী, আতাউর, শাহজালাল, সেলিম রেজাসহ আরও বেশ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে। দীর্ঘ দিন ধরে তারা নদী থেকে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলন ও বিক্রি করে আসছেন। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
নদীপাড়ের এক ভূমিহীন বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন,"আমরা গরিব মানুষ। ভিটা ছাড়া আমাদের আর কোনো জমিজমা নেই। যেভাবে মাটি তোলা হচ্ছে, তাতে সামনের বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙন মারাত্মক আকার ধারণ করবে। আমরা আমাদের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু হারানোর ভয়ে আছি।"
জাজিরা এলাকার বাসিন্দা রফিক দৈনিক অর্থনীতির কাগজকে জানান, প্রভাবশালীরা কাউকে তোয়াক্কা করছে না। প্রশাসন যেন দেখেও না দেখার ভান করে আছে। অন্যদিকে কৃষক রমিজ উদ্দিন বলেন, ইটভাটার মালিক ও প্রভাবশালী এই চক্রের কারণে আমাদের চাষের জমিও আজ হুমকির মুখে।
প্রশাসনের আশ্বাস ও অভিযান : এই বিষয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "অবৈধভাবে মাটি উত্তোলনকারীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা ইতিমধ্যে অপরাধীদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছি এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উমর ফারুক দৈনিক অর্থনীতির কাগজকে জানান, প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। তিনি বলেন, "মাটি কাটার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। যারা নদীর পরিবেশ নষ্ট করছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
ভবিষ্যৎ শঙ্কা : স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, যদি এখনই এই অবৈধ মাটি কাটা বন্ধ করা না যায়, তবে আগত বর্ষা মৌসুমে বুড়িগঙ্গার পাড় ধসে বিলীন হয়ে যেতে পারে শত শত ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। পরিবেশের এই অপূরণীয় ক্ষতি রোধে দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
