তেল সংকটে ঈদে লঞ্চ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা। দক্ষিণমুখী মানুষের লঞ্চে ফেরা কি তবে অনিশ্চিত?

 প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬, ০৪:৩৮ অপরাহ্ন   |   রাজধানী

তেল সংকটে ঈদে লঞ্চ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা।  দক্ষিণমুখী মানুষের লঞ্চে ফেরা কি তবে অনিশ্চিত?

মাহফুজার রহমান :


​ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের ফলে বিশ্ববাজারে দেখা দিয়েছে তেলের সংকট। এতে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে থেকে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। তেল সংকটে পড়েছেন ঢাকার সদরঘাটের লঞ্চ মালিকরা। চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় দূরপাল্লার লঞ্চ চলাচল কমে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

​সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন সদরঘাটের লঞ্চ ও কার্গো জাহাজের জন্য প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ লিটার তেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ থেকে ৬০ হাজার লিটার। ফলে লঞ্চ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টির হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল সংস্থার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আলহাজ্ব বদিউজ্জামান বাদল দৈনিক অর্থনীতির কাগজকে জানান, পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে নৌপরিবহন, রেলপথ এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে।

​অন্যদিকে লঞ্চে তেল সরবরাহকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ রিভার ফুয়েল ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জিএম সারোয়ার হোসেন দৈনিক অর্থনীতির কাগজকে বলেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও যমুনা পেট্রোলিয়ামের ফতুল্লা ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল দেওয়া হচ্ছে না। সারাদিন অপেক্ষার পর তারা চাহিদার তুলনায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কম তেল পাচ্ছেন। এর ফলে সদরঘাট থেকে দক্ষিণাঞ্চলের লঞ্চ চলাচল কমে গেছে বলে তিনি দাবি করেন।

​গত মঙ্গলবার সদরঘাট ও তেলঘাট এলাকা ঘুরে এ তথ্য জানতে পারে  দৈনিক অর্থনীতির কাগজ । সেদিন দুপুরে বাংলাদেশ রিভার ফুয়েল ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জিএম সারোয়ার হোসেন সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে জরুরি সভা করেন। সভায় জানানো হয়, যমুনা পেট্রোলিয়ামের ফতুল্লা ডিপো থেকে তেল সংগ্রহ করে লঞ্চে সরবরাহ করে ওটি প্রিন্স ও ওটি জোহা নামের দুটি প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ফতুল্লা ডিপো থেকে তেল সংগ্রহ করে ওটি বাংলাদেশ ফ্লোটিং পাম্প ও জহুরা কর্পোরেশনসহ মোট চারটি প্রতিষ্ঠান লঞ্চে তেল সরবরাহ করে থাকে।

​ওটি বাংলাদেশ ফ্লোটিং পাম্পের মালিক তৈয়বুর রহমান জানান, প্রতিদিন সদরঘাটের লঞ্চ ও অন্যান্য কার্গো জাহাজে তারা আড়াই থেকে তিন লাখ লিটার তেল সরবরাহ করেন। ঈদের সময় এ চাহিদা বেড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ লিটারে পৌঁছে। কিন্তু গত তিনদিন ধরে চাহিদার তুলনায় তারা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কম তেল পাচ্ছেন।

​তিনি বলেন, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ফতুল্লা ডিপোর সুপারভাইজার জানিয়েছেন, সদরঘাটের জন্য তাদের কোনো নির্দিষ্ট বরাদ্দ নেই। ফলে তারা সীমিত পরিমাণ তেল পাচ্ছেন। যমুনা পেট্রোলিয়াম থেকে তেল সংগ্রহকারীদের অবস্থাও একই বলে জানা গেছে।

​বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঢাকা নদীবন্দর থেকে ৪৬টি নৌপথে লঞ্চ চলাচল করে। আসন্ন ঈদ উপলক্ষে এসব নৌপথে প্রায় ১৪০টি লঞ্চ চলাচল করবে। বর্তমানে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০টি লঞ্চ চলাচল করছে। এসব লঞ্চ চলাচলের জন্য গড়ে প্রতিদিন প্রায় আড়াই লাখ লিটার তেলের প্রয়োজন হয়।

​লঞ্চমালিকদের অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় অবস্থিত পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ডিপো ছাড়াও ঘোড়াশাল, ভৈরব, নরসিংদী, আরিচা, বরিশাল ও চাঁদপুরের ডিপো থেকেও পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না।

​এ বিষয়ে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ফতুল্লা ডিপোর সুপারভাইজার জালাল উদ্দিন তেল সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, সদরঘাটে যে তেল যায় তা মূলত ফ্লোটিং পাম্প ও এজেন্টের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী বর্তমানে এজেন্টের মাধ্যমে তেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

​তিনি বলেন, সামনে ঈদ হওয়ায় সদরঘাট থেকে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০টি লঞ্চ চলাচল করে। তাদের জন্য তেল সরবরাহ চালুর বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। সরকার অনুমোদন দিলে তেল সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

​এদিকে ঢাকা নদীবন্দর (সদরঘাট) পোর্ট অফিসার ও নৌ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোবারক হোসেন মজুমদার বলেন, তেল সরবরাহ কম হচ্ছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয় গুরুত্বসহকারে দেখছে। এ নিয়ে উচ্চপর্যায়ে বৈঠকের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

​তিনি আরও জানান, ঈদ উপলক্ষে সদরঘাটের নিরাপত্তা জোরদার করতে ৬০টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। এছাড়া সদরঘাটের চাপ কমাতে মোহাম্মদপুরের বসিলা ও কাঞ্চন-শিমুলিয়া ঘাট থেকে নতুন লঞ্চ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। যাত্রীদের সুবিধার্থে বয়স্ক ও অসুস্থদের জন্য হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা এবং ডেক যাত্রীদের ভাড়ায় ১০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।