সব শ্রেণির মানুষের জন্য ৪ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর
প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২০, ০৫:২৭ অপরাহ্ন | জাতীয়
৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বিস্তারের বড় একটি প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে। উৎপাদনমুখী শিল্প কারখানাগুলোতে যেমন অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি চাহিদা কমেছে, তেমনি নিম্ন আয়ের মানুষজনের উপার্জনের পথও রুদ্ধ হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় সব ধরনের অর্থনৈতিক স্তরের মানুষদের জন্যই কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। সে অনুযায়ী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্বল্প মেয়াদি, অর্থাৎ দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য চার কার্যক্রম ঘোষণা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
রোববার (৫ এপ্রিল) সকালে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এ কার্যক্রমের ঘোষণা দেন। দেশের অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের প্রভাব এবং তা মোকাবিলায় আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণাসহ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো তুলে ধরতে এই সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতির ওপর করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় আমরা স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে পারলে করোনাভাইরাসের প্রভাব অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করি।
প্রধানমন্ত্রী যে চার কার্যক্রম ঘোষণা করেন সেগুলো হলো—
ক. সরকারি ব্যয় বাড়ানো: জনগণ যেন আর্থিক কষ্ট না পায়, সেজন্য সরকারি ব্যয় বাড়ানো হবে। এ ক্ষেত্রে কর্মসৃজনকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। বিদেশ ভ্রমণ বা বিলাসী ব্যয় নিরুৎসাহিত করা হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের ঋণের স্থিতির সঙ্গে জিডিপি’র অনুপাত অত্যন্ত কম (৩৪ শতাংশ)। ফলে সরকারি ব্যয় বাড়লেও সেটা সামষ্টিক অর্থনীতিতে কোনো চাপ তৈরি করবে না।
খ. আর্থিক সহায়তার প্যাকেজ প্রণয়ন: আর্থিক অভিঘাত মোকাবিলায় ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা চালু করা হবে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করা, শ্রমিক-কর্মচারীদের কাজে বহাল রাখা ছাড়াও উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখা হবে এসব আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের মূল উদ্দেশ্য। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মনে রাখতে হবে, মানুষ যেন কর্মহীন না হয়ে পড়ে। আর বৃহৎ শিল্প কারখানাই হোক আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীই হোক, সবার জন্যই আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ প্রয়োজন হবে।
গ. সামাজিক সুরক্ষার আওতা বৃদ্ধি: সরকারের যে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি রয়েছে, তার আওতা আরও বাড়ানো হবে। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী যে জনগোষ্ঠী (দিনমজুর বা অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত) তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা হবে। এর আওতায় যেসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে সেগুলো হলো—
১. বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ;
২. ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রি;
৩. প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে নগদ অর্থ বিতরণ;
৪. বয়স্ক ও বিধবা ভাতা দারিদ্রপ্রবণ ১০০ উপজেলায় শতভাগে উন্নীত করা;
৫. জাতির পিতার শতবর্ষ উপলক্ষে হাতে নেওয়া গৃহহীন মানুষের গৃহ নির্মাণ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন।
ঘ. মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানো: বাংলাদেশ ব্যাংক সিআরআর ও রেপো হার কমিয়ে মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানোর ব্যবস্থা নিয়েছি। প্রয়োজনে আগামীতেও এ ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। তবে আমাদের লক্ষ্য থাকবে, মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে গেলেও যেন মূল্যস্ফীতি না ঘটে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতির বিরূপ প্রভাব কাটিয়ে উঠতে মুদ্রা সরবরাহ অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ। সে অনুযায় বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা নেবে।
পরে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন ধরনের শিল্প খাতের জন্য অর্থনৈতিক প্রণোদনার প্যাকেজের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
প্যাকেজ-১ : ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের জন্য ৩০ হাজার কোটি ঋণ সুবিধা
ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সুবিধা দেয়া, ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বল্পসুদে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দেয়ার লক্ষ্যে ৩০ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ সুবিধা প্রণয়ন করা হবে। ব্যাংক-ক্লায়েন্ট রিলেশনসের ভিত্তিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সংশ্লিষ্ট শিল্প/ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে তাদের নিজস্ব তহবিল হতে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বাবদ ঋণ দেয়া।
এ ঋণ সুবিধার সুদের হার হবে ৯ শতাংশ। প্রদত্ত ঋণের সুদের অর্ধেক অর্থাৎ ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ ঋণ গ্রহিতা শিল্প/ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিশোধ করবে এবং অবশিষ্ট ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ সরকার ভর্তুকি হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে দেবে।
প্যাকেজ-২ : ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সুবিধা প্রদান)
ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বল্পসুদে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল প্রদানের লক্ষ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ সুবিধা প্রণয়ন করা হবে। ব্যাংক-ক্লায়েন্ট রিলেশনসের ভিত্তিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে তাদের নিজস্ব তহবিল হতে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বাবদ ঋণ দেবে।
এ ঋণ সুবিধার সুদের হারও হবে ৯ শতাংশ। ঋণের ৪ শতাংশ সুদ ঋণগ্রহিতা শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিশোধ করবে এবং অবশিষ্ট ৫ শতাংশ সরকার ভর্তুকি হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে দেবে।
প্যাকেজ-৩ : বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবর্তিত এক্সপোর্ট ডেভলপমেন্ট ফান্ডের (ইডিএফ) সুবিধা বাড়ানো
ব্লক টু ব্লক এলসির আওতায় কাঁচামাল আমদানি সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ই রফতানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) বর্তমান আকার ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হবে। ফলে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অতিরিক্ত ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ইডিএফ তহবিলে যুক্ত হবে। ইডিএফ-এর বর্তমান সুদের হার LIBOR + ১.৫ শতাংশ (যা প্রকৃত পক্ষে ২.৭৩%) হতে কমিয়ে ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হবে।
প্যাকেজ-৪ : ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ সুবিধা
প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্স স্কিম নামে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন ঋণ সুবিধা চালু করবে। এ ঋণ সুবিধার সুদের হার হবে ৭ শতাংশ।
প্যাকেজ-৫: আগের ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ
ইতোপূর্বে রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন/ভাতা পরিশোধ করার জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি আপৎকালীন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। নতুন চারটিসহ মোট পাঁচটি প্যাকেজে আর্থিক সহায়তার পরিমাণ হবে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা যা জিডিপি’র প্রায় ২.৫২ শতাংশ।
সারা বিশ্বে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে এসব প্যাকেজ ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আশা করি, পূর্বে এবং আজকে ঘোষিত আর্থিক সহায়তার প্যাকেজসমূহ দ্রুত বাস্তবায়িত হলে আমাদের অর্থনীতি পুনরায় ঘুরে দাঁড়াবে এবং আমরা কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কাছাকাছি পৌঁছতে পারব, ইনশাআল্লাহ।’
সবাইকে দেশীয় পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধিও আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সম্ভাব্য এই বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক সংকট হতে উত্তরণের জন্য রফতানি খাতের পাশাপাশি দেশীয় পণ্যের প্রতি আমাদের বিশেষ নজর দিতে হবে। এক্ষেত্রে আমি সকলকে দেশীয় পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, সকল প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে বাংলাদেশের মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের রয়েছে আশ্চর্য এক সহনশীল ক্ষমতা এবং ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা। ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যে জাতি মাত্র ৯ মাসে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে, সে জাতিকে কোনো কিছুই দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’
প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার পর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউস, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া ও প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিমসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

