ঈদযাত্রার প্রস্তুতি: রং মেখে নতুন সাজে নামছে পুরনো লক্কড় -ঝক্কড় ফিটনেসবিহীন লঞ্চ
প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬, ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন | জাতীয়
মাহফুজার রহমান :
পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানী ছেড়ে যাওয়া বিপুলসংখ্যক ঘরমুখো মানুষের যাতায়াতে স্থলপথের মতো নৌপথও এখন প্রস্তুতিতে সরগরম। প্রতি বছরই ঈদের এই বাড়তি চাপ সামলাতে লঞ্চ মালিকরা তাদের পুরনো এবং ফিটনেসবিহীন লঞ্চগুলোকে কোনোমতে মেরামত করে ঘাটে নামান। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ডকইয়ার্ডগুলোতে দিন-রাত চলছে পুরনো ও জরাজীর্ণ লঞ্চগুলোকে নতুন রং আর সাজসজ্জায় ঢেকে ফেলার কাজ।
বুড়িগঙ্গার তীরে ব্যস্ত ডকইয়ার্ড:
কেরানীগঞ্জের বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে গড়ে ওঠা চর কালিগঞ্জ থেকে কোন্ডা ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি ডকইয়ার্ডে এখন কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে হাতুড়ি আর টিনের ঠোকাঠুকি শব্দ। সেখানে যাত্রীবাহী ও বড় বড় কার্গো লঞ্চের মেরামতের মহোৎসব চলছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন—কেউ ওয়েল্ডিং করছেন, কেউ মরিচা পরিষ্কার করছেন, আবার কেউ ব্যস্ত রং করার কাজে।
ডকইয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, অন্তত ১০টি ডকইয়ার্ডে মীরেরবাগ থেকে মাদারীপুর পর্যন্ত প্রায় সাতটি বড় আকারের পুরনো লঞ্চে রঙ ও মেরামতের কাজ চলছে। ফিটনেসবিহীন এসব লঞ্চের জীর্ণ অংশগুলো জোড়াতালি দিয়ে রঙের পোচ দিয়ে নতুনের মতো দেখানো হচ্ছে। কোথাও কোথাও লোহার পাত বসিয়ে কাঠামো মেরামত করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা শুধু নামমাত্র।
শ্রমিকদের ভাষ্য ও নিরাপত্তার অভাব:
ডকইয়ার্ডের শ্রমিক রবিউল জানান, "ঈদের আগে হঠাৎ করেই কাজের চাপ বেড়ে যায়। বছরের অন্যান্য সময় এসব লঞ্চ খুব একটা মেরামত করা হয় না, কিন্তু ঈদ ঘনিয়ে এলে দ্রুত রঙ ও সামান্য মেরামত করে যাত্রী পরিবহনের জন্য প্রস্তুত করা হয়। চাঁদপুরের বাসিন্দা ম্যানেজার ইমরান হোসেন দৈনিক অর্থনীতির কাগজকে বলেন লঞ্চ আবার নতুন করে রং করেলেও ইঞ্জিন তো সেই পুরনো । তাই দুর্ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি " নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক শ্রমিক দৈনিক অর্থনীতির কাগজকে বলেন, "অনেক পুরনো লঞ্চ যখন ডকে আসে, তখন তড়িঘড়ি করে চলাচলের মতো করে দেওয়া হয়। এতে বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়লেও ইঞ্জিনের বা তলদেশের যান্ত্রিক পরীক্ষা সেভাবে করা হয় না।"
সচেতন মহলের উদ্বেগ:
ভোলাগামী যাত্রী ও আমান প্লাস্টিকের অটোঘর অপারেটর রিপন হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে দৈনিক অর্থনীতির কাগজকে বলেন, "ঈদযাত্রায় আমাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। মালিকরা শুধু মুনাফার কথা ভাবেন, নিরাপত্তার কথা নয়। বাইরে থেকে সুন্দর দেখালেও মাঝনদীতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে আমাদের জীবন বিপন্ন হতে পারে।" স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, নৌপথে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি এবং নিয়মিত পরিদর্শন জরুরি।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:
এ বিষয়ে প্রিন্স অব আওলাদ লঞ্চের পরিচালক মো. যুবরাজ দৈনিক অর্থনীতির কাগজকে জানান, প্রতি বছরই ঈদের আগে লঞ্চগুলো মেরামত ও রঙ করা হয়। তবে লক্কড়-ঝক্কড় বা ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচলের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
অন্যদিকে, ঢাকার নদীবন্দরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মতে, কোনো ফিটনেসবিহীন নৌযান চলাচলের অনুমতি নেই। বিআইডব্লিউটিএ এবং নৌ-নিরাপত্তা শাখা থেকে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ফিটনেস সনদ পরীক্ষা করেই লঞ্চগুলোকে ঘাটে ভিড়তে দেওয়া হবে। তবে লোকচক্ষুর আড়ালে ডকইয়ার্ডগুলোতে চলা এসব ‘মেকআপ’ করা লঞ্চের ক্ষেত্রে প্রশাসনের বিশেষ টহল প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
